চা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ চা পান করেন। অনেকেই ধোঁয়া ওঠা গরম চা খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অতিরিক্ত গরম চা কি সত্যিই প্রাণঘাতী হতে পারে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো: সরাসরি নয়, তবে খুব গরম পানীয় নিয়মিত পান করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্যনালির (Esophagus) ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এটি তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি তাপজনিত ক্ষতির সম্ভাব্য প্রভাব।
পোস্ট সূচিপত্র
‘অতিরিক্ত গরম চা’ বলতে কী বোঝায়?
গরম চা শরীরে কীভাবে প্রভাব ফেলে?
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
WHO ও IARC কী বলেছে?
খাদ্যনালি কেন বেশি ঝুঁকিতে?
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন?
খুব গরম চা নিয়ে বড় গবেষণাগুলো কী বলছে?
৬০°–৬৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইরানের বড় গবেষণা
যুক্তরাজ্যের গবেষণা
WHO ও IARC-এর মূল্যায়ন
গরম চা বনাম গরম কফি
মুখ ও জিহ্বায় কী হয়?
খাদ্যনালির ক্যান্সারের লক্ষণ কী?
নিরাপদভাবে চা পান করার উপায়
যাদের আরও সতর্ক থাকা উচিত
গরম চা নিয়ে ১০টি প্রচলিত ভুল ধারণা
চায়ের উপকারিতাও রয়েছে
চা পানের নিরাপদ অভ্যাস
কারা চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
দৈনন্দিন জীবনে কী করবেন?
উপসংহার
FAQ
‘অতিরিক্ত গরম চা’ বলতে কী বোঝায়?
চায়ের স্বাদ একেকজনের কাছে একেক রকম হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিষয়টি তাপমাত্রা দিয়ে বিবেচনা করা হয়। গবেষণায় সাধারণভাবে প্রায় ৬০° সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার পানীয় নিয়মিত পান করাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা IARC-ও খুব গরম পানীয় নিয়ে গবেষণার ফল বিশ্লেষণ করেছে। এর অর্থ এই নয় যে ৬০° সেলসিয়াসের এক চুমুকই বিপজ্জনক। বরং বহু বছর ধরে নিয়মিত অত্যন্ত গরম পানীয় পান করাই উদ্বেগের বিষয়।
গরম চা শরীরে কীভাবে প্রভাব ফেলে?
চা নিজে সাধারণত ক্ষতিকর নয়। সমস্যা হতে পারে তাপমাত্রার কারণে। যখন খুব গরম তরল মুখ, গলা এবং খাদ্যনালির ভেতরের নরম টিস্যুর সংস্পর্শে আসে, তখনঃ
- সাময়িকভাবে টিস্যু উত্তপ্ত হয়।
- সূক্ষ্ম তাপজনিত ক্ষতি হতে পারে।
- বারবার একই ধরনের ক্ষতি হলে কোষ মেরামতের প্রক্রিয়া বারবার সক্রিয় হয়।
- দীর্ঘ সময়ে এই পুনরাবৃত্ত ক্ষতি কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এটি একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি, নিশ্চিত কারণ নয়।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
বিভিন্ন দেশে পরিচালিত পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে খুব গরম চা বা অন্যান্য গরম পানীয় পান করেন, তাদের মধ্যে খাদ্যনালির স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার (Esophageal Squamous Cell Carcinoma) ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোঃ
- এসব গবেষণা সম্পর্ক (association) দেখায়।
- এগুলো কারণ (causation) প্রমাণ করে না।
- ধূমপান, অ্যালকোহল, খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য ঝুঁকির কারণও একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে।
WHO ও IARC কী বলেছে?
২০১৬ সালে International Agency for Research on Cancer (IARC) উপলব্ধ বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করে জানায়ঃ
- খুব গরম পানীয় (প্রায় ৬৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি) পান করা সম্ভবত খাদ্যনালির ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- তবে চা বা কফি নিজে ক্যান্সারের কারণ এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
- মূল উদ্বেগের বিষয় হলো তাপমাত্রা, পানীয়ের ধরন নয়।
এই কারণে "গরম চা ক্যান্সার করে" বলা সঠিক নয়; বরং বলা উচিত, অত্যন্ত গরম পানীয় নিয়মিত পান করা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
খাদ্যনালি কেন বেশি ঝুঁকিতে?
খাদ্যনালি (Esophagus) মুখ থেকে পাকস্থলী পর্যন্ত খাবার পৌঁছে দেয়। এর ভেতরের আবরণঃ
- তুলনামূলকভাবে কোমল।
- অতিরিক্ত তাপের প্রতি সংবেদনশীল।
- বারবার তাপজনিত ক্ষতিতে দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তনের ঝুঁকি থাকতে পারে।
এই কারণেই গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে খাদ্যনালি।
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন?
বর্তমান গবেষণার ভিত্তিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি বেশি হতে পারে যদি কেউঃ
- বহু বছর ধরে খুব গরম চা পান করেন।
- দ্রুত বড় বড় চুমুকে পান করেন।
- একই সঙ্গে ধূমপান করেন।
- অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করেন।
- খাদ্যনালির অন্যান্য ঝুঁকির কারণ থাকে।
এর মানে এই নয় যে এমন প্রত্যেকেরই ক্যান্সার হবে। ঝুঁকি ব্যক্তি ও জীবনযাত্রাভেদে ভিন্ন হতে পারে।
খুব গরম চা নিয়ে বড় গবেষণাগুলো কী বলছে?
প্রথম পর্বে আমরা জেনেছি যে সমস্যা চায়ে নয়, বরং অতিরিক্ত তাপমাত্রায়। এবার দেখা যাক, আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো কী বলছে এবং বাস্তবে ঝুঁকিটা কতটা।
৬০°–৬৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
খুব গরম পানীয় নিয়ে গবেষণায় সাধারণত ৬০–৬৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রাকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। এর কারণঃ
- এই তাপমাত্রায় মুখ ও খাদ্যনালির সংবেদনশীল টিস্যুতে তাপজনিত ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
- যদি এটি বহু বছর ধরে নিয়মিত ঘটে, তাহলে কোষে পুনঃপুন ক্ষত ও মেরামতের প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
- দীর্ঘমেয়াদে এটি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এক কাপ চা যদি বানানোর সঙ্গে সঙ্গেই পান করা হয়, তবে সেটি অনেক সময় ৭০° সেলসিয়াসেরও বেশি গরম থাকতে পারে। তাই কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে পান করা সাধারণত নিরাপদ।
ইরানের বড় গবেষণা
ইরানের গোলেস্তান অঞ্চলে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অত্যন্ত গরম চা নিয়মিত পান করেন এবং চা ঠান্ডা না করেই দ্রুত পান করেন, তাদের মধ্যে খাদ্যনালির ক্যান্সারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে গবেষকেরা এটিও উল্লেখ করেছেন যে এটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। অর্থাৎ এটি একটি সম্পর্ক দেখায়, কিন্তু সরাসরি কারণ প্রমাণ করে না।
যুক্তরাজ্যের গবেষণা
যুক্তরাজ্যে পরিচালিত একটি বৃহৎ গবেষণায়ও দেখা গেছে, যারা খুব গরম চা পান করার পাশাপাশি অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ এবং ধূমপান করেন, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। এটি থেকে বোঝা যায়, একাধিক ঝুঁকির কারণ একসঙ্গে থাকলে সম্ভাব্য ক্ষতি বাড়তে পারে।
WHO ও IARC-এর মূল্যায়ন
আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (IARC) উপলব্ধ বৈজ্ঞানিক তথ্য পর্যালোচনা করে বলেছেঃ
- ৬৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার পানীয় নিয়মিত পান করা সম্ভবত খাদ্যনালির ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- কিন্তু চা বা কফির উপাদানকে ক্যান্সারের কারণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি।
অর্থাৎ সমস্যা পানীয়ের ধরন নয়, বরং তাপমাত্রা।
গরম চা বনাম গরম কফি
অনেকে মনে করেন শুধু চা ক্ষতিকর। আসলেঃ
- খুব গরম চা
- খুব গরম কফি
- খুব গরম স্যুপ
- অত্যন্ত গরম অন্যান্য পানীয়
সব ক্ষেত্রেই মূল উদ্বেগ অতিরিক্ত তাপমাত্রা। তাই শুধু চা এড়িয়ে কফি পান করলেও, যদি সেটি অত্যন্ত গরম হয়, একই ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে।
মুখ ও জিহ্বায় কী হয়?
খুব গরম চা দ্রুত পান করলেঃ
- জিহ্বা পুড়ে যেতে পারে।
- মুখের ভেতরের নরম টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- তালুতে অস্বস্তি হতে পারে।
- গলায় জ্বালাপোড়া অনুভূত হতে পারে।
এসব ক্ষতি সাধারণত সাময়িক হলেও বারবার ঘটলে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
খাদ্যনালির ক্যান্সারের লক্ষণ কী?
এই নিবন্ধটি কোনো রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে নিচের লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিতঃ
- খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া
- দীর্ঘস্থায়ী গলাব্যথা
- অকারণে ওজন কমে যাওয়া
- খাবার আটকে যাওয়ার অনুভূতি
- বারবার বমি বা রক্তমিশ্রিত বমি (জরুরি অবস্থা)
এসব লক্ষণ থাকলেই যে ক্যান্সার হয়েছে, এমন নয়। তবে মূল্যায়নের জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি।
নিরাপদভাবে চা পান করার উপায়
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শঃ
- চা বানানোর পর ৩–৫ মিনিট অপেক্ষা করুন।
- ধোঁয়া ওঠা অবস্থায় বড় চুমুক দেবেন না।
- প্রথমে ছোট চুমুকে তাপমাত্রা পরীক্ষা করুন।
- খুব গরম পানীয় দ্রুত পান না করে ধীরে ধীরে পান করুন।
- শিশুদের কখনোই অতিরিক্ত গরম চা দেবেন না।
যাদের আরও সতর্ক থাকা উচিত
নিচের ব্যক্তিদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা ভালোঃ
- বয়স্ক ব্যক্তি
- যাদের খাদ্যনালির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা আছে
- যাদের মুখে বারবার ঘা হয়
- যাদের গিলতে সমস্যা হয়
- ধূমপায়ী ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনকারী
গরম চা নিয়ে ১০টি প্রচলিত ভুল ধারণা
প্রথম দুই পর্বে আমরা দেখেছি, সমস্যা চায়ে নয়, বরং অত্যন্ত বেশি তাপমাত্রায়। এবার গরম চা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো, চায়ের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা এবং নিরাপদভাবে চা পানের অভ্যাস নিয়ে আলোচনা করা হলো।
ভুল ধারণা ১: গরম চা খেলেই ক্যান্সার হয়
এটি সঠিক নয়। বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, এক কাপ গরম চা পান করলেই ক্যান্সার হবে এমন কোনো প্রমাণ নেই। উদ্বেগের বিষয় হলোঃ
- বহু বছর ধরে
- নিয়মিত
- অত্যন্ত গরম (প্রায় ৬৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি) পানীয় পান করা
এটি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্যনালির ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ভুল ধারণা ২: শুধু চা ক্ষতিকর
এটিও ভুল। সমান তাপমাত্রারঃ
- কফি
- স্যুপ
- হারবাল টি
- গরম দুধ
- অন্য যেকোনো গরম পানীয়
একই ধরনের তাপজনিত প্রভাব ফেলতে পারে।
ভুল ধারণা ৩: লিকার চা দুধ চায়ের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর
এমন কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ঝুঁকির প্রধান কারণঃ
- পানীয় কত গরম
- কত দ্রুত পান করা হচ্ছে
- কত বছর ধরে এই অভ্যাস রয়েছে
দুধ আছে কি নেই, সেটি এই ঝুঁকির মূল বিষয় নয়।
ভুল ধারণা ৪: ঠান্ডা চা সবসময় স্বাস্থ্যকর
অতিরিক্ত চিনি মেশানো আইসড টি বা বোতলজাত মিষ্টি চা নিয়মিত পান করাও স্বাস্থ্যকর নয়। অর্থাৎঃ
- খুব গরম পানীয় ক্ষতিকর হতে পারে।
- আবার অতিরিক্ত চিনি মেশানো ঠান্ডা পানীয়ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ভুল ধারণা ৫: ধোঁয়া উঠছে মানেই নিরাপদ
অনেকে মনে করেন ধোঁয়া ওঠা চা যত গরম, তত ভালো। আসলে ধোঁয়া ওঠা মানেই চায়ের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকতে পারে। তাই কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে পান করাই ভালো।
ভুল ধারণা ৬: মুখ না পুড়লে কোনো সমস্যা নেই
মুখ না পুড়লেও পানীয়টি খাদ্যনালির জন্য খুব গরম হতে পারে। তাই শুধু অনুভূতির ওপর নির্ভর না করে একটু ঠান্ডা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা ভালো।
ভুল ধারণা ৭: প্রতিদিন এক কাপ গরম চা প্রাণঘাতী
না। বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, এমন দাবি সঠিক নয়।
ঝুঁকি নির্ভর করেঃ
- তাপমাত্রা
- দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস
- ধূমপান
- অ্যালকোহল
- অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির ওপর
চায়ের উপকারিতাও রয়েছে
চা নিয়ে আলোচনায় শুধু ঝুঁকি নয়, সম্ভাব্য উপকারিতাও জানা জরুরি। চায়ে বিভিন্ন ধরনের পলিফেনল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যাঃ
- কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
- সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে উপকারী হতে পারে।
তবে এসব উপকারিতা পেতে চা অতিরিক্ত গরম অবস্থায় পান করার প্রয়োজন নেই।
চা পানের নিরাপদ অভ্যাস
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ:
১. কয়েক মিনিট অপেক্ষা করুন
চা তৈরি হওয়ার পর ৩–৫ মিনিট অপেক্ষা করলে তাপমাত্রা অনেকটাই কমে যায়।
২. ছোট চুমুক দিয়ে শুরু করুন
প্রথমেই বড় চুমুক না দিয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষা করুন।
৩. ধীরে পান করুন
খুব দ্রুত গরম পানীয় পান না করে ধীরে ধীরে পান করলে মুখ ও গলার অস্বস্তিও কম হয়।
৪. শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
শিশুদের মুখ ও গলার টিস্যু আরও সংবেদনশীল। তাই তাদের কখনোই ধোঁয়া ওঠা গরম চা দেওয়া উচিত নয়।
কারা চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
নিচের লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিতঃ
- খাবার গিলতে অসুবিধা
- দীর্ঘস্থায়ী গলাব্যথা
- অকারণে ওজন কমে যাওয়া
- বারবার বুকজ্বালা
- খাবার আটকে যাওয়ার অনুভূতি
এসব উপসর্গের অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।
দৈনন্দিন জীবনে কী করবেন?
সহজ কয়েকটি অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারেঃ
- ধোঁয়া ওঠা চা সঙ্গে সঙ্গে পান না করা।
- অতিরিক্ত গরম কফি বা স্যুপের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম মানা।
- ধূমপান পরিহার করা।
- অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত রাখা।
- সুষম খাদ্য ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনুসরণ করা।
উপসংহার
চা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়গুলোর একটি। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ চা পান করেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারার অংশ হতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, চা নয়, বরং অত্যন্ত গরম অবস্থায় নিয়মিত পান করাই উদ্বেগের বিষয়। বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অনুযায়ী, প্রায় ৬৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার পানীয় দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পান করলে খাদ্যনালির (Esophagus) ক্যান্সারের ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে এক কাপ গরম চা পান করলেই ক্যান্সার হবে বা তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হবে।
এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস, তাপমাত্রা এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণ যেমন ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পরামর্শ হলো, চা বানানোর পর কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে পান করুন। যদি চা এতটাই গরম হয় যে মুখ বা জিহ্বা পুড়ে যাওয়ার অনুভূতি হয়, তাহলে সেটি আরও কিছুটা ঠান্ডা হতে দিন। ছোট এই অভ্যাস ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
FAQ
১. অতিরিক্ত গরম চা কি সরাসরি প্রাণঘাতী?
না। সাধারণভাবে অতিরিক্ত গরম চা তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণঘাতী নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গরম পানীয় নিয়মিত পান করলে খাদ্যনালির ক্যান্সারের ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে।
২. কোন তাপমাত্রার চা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে?
গবেষণায় সাধারণত ৬৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার পানীয় নিয়মিত পান করার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। তাই চা কিছুটা ঠান্ডা করে পান করা ভালো।
৩. গরম কফিও কি একই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?
হ্যাঁ। ঝুঁকির মূল কারণ পানীয়ের তাপমাত্রা। খুব গরম কফি, স্যুপ বা অন্য গরম পানীয়ের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রযোজ্য।
৪. চা বানানোর কতক্ষণ পর পান করা উচিত?
চা তৈরির পর সাধারণভাবে ৩–৫ মিনিট অপেক্ষা করলে তাপমাত্রা কিছুটা কমে যায়। পরিবেশ, কাপের ধরন ও চায়ের পরিমাণ অনুযায়ী সময় কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
৫. প্রতিদিন চা পান করা কি নিরাপদ?
পরিমিত পরিমাণে এবং অতিরিক্ত গরম না হলে অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য চা পান সাধারণত নিরাপদ। তবে ব্যক্তিভেদে স্বাস্থ্যগত অবস্থা ভিন্ন হতে পারে।
৬. মুখ বা গলা বারবার পুড়ে গেলে কী করবেন?
বারবার এমন হলে খুব গরম পানীয় এড়িয়ে চলুন। যদি গিলতে সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা অন্য উদ্বেগজনক উপসর্গ থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।