অস্ট্রিয়ার জনপ্রিয় খাবার উইনার শ্নিটজেল | সহজ রেসিপি

ছুটির দিন মানেই পরিবারের সঙ্গে বিশেষ কিছু খাওয়ার পরিকল্পনা। সপ্তাহজুড়ে ব্যস্ততার পর অনেকেই চান ঘরে বসেই নতুন কোনো আন্তর্জাতিক খাবারের স্বাদ নিতে। ইতালিয়ান পাস্তা, আমেরিকান বার্গার কিংবা চাইনিজ নুডলসের পাশাপাশি ইউরোপীয় খাবারের প্রতিও এখন আগ্রহ বাড়ছে। আর অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো উইনার শ্নিটজেল (Wiener Schnitzel)

বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ ফ্রাইড কাটলেটের মতো মনে হলেও এর স্বাদ, প্রস্তুত প্রণালী এবং পরিবেশনের ধরন একে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। এই নিবন্ধে জানানো হবে উইনার শ্নিটজেলের ইতিহাস, পুষ্টিগুণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ, ধাপে ধাপে তৈরির পদ্ধতি, পরিবেশনের কৌশল, সাধারণ ভুল এবং নিখুঁত শ্নিটজেল বানানোর বিশেষ টিপস।

উইনার শ্নিটজেল কী?

উইনার শ্নিটজেল অস্ট্রিয়ার জাতীয় খাবার হিসেবে পরিচিত। পাতলা করে পিটিয়ে নেওয়া মাংস, ময়দা, ডিম এবং ব্রেডক্রাম্বের আবরণে মোড়ানো সোনালি খাস্তা স্তর, সঙ্গে লেবুর টুকরো এবং আলুর সালাদ, সব মিলিয়ে এটি ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। ভিয়েনার ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই খাবারটি আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমানভাবে সমাদৃত। ভালো খবর হলো, খুব বেশি জটিল উপকরণ ছাড়াই ঘরোয়া রান্নাঘরে তৈরি করা সম্ভব সুস্বাদু উইনার শ্নিটজেল।

জার্মান ভাষায় "Wiener" শব্দের অর্থ ভিয়েনার এবং "Schnitzel" অর্থ পাতলা কাটা মাংসের টুকরো। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী উইনার শ্নিটজেল তৈরি করা হয় বাছুরের মাংস (Veal) দিয়ে। তবে বর্তমানে অনেক দেশে এটি তৈরি করা হয়ঃ

  • মুরগির মাংস
  • গরুর মাংস
  • টার্কি
  • শূকরের মাংস

যদিও অস্ট্রিয়ান খাদ্য আইন অনুযায়ী আসল উইনার শ্নিটজেল বলতে বাছুরের মাংস দিয়ে তৈরি সংস্করণকেই বোঝায়।

উইনার শ্নিটজেলের ইতিহাস

  • উইনার শ্নিটজেলের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো।
  • খাদ্য ইতিহাসবিদদের মতে, এর উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে।
  • কিছু গবেষকের মতে, ইতালির মিলান শহরের বিখ্যাত কোটোলেত্তা আল্লা মিলানেজে (Cotoletta alla Milanese) থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছে এই খাবার।
  • পরবর্তীতে অস্ট্রিয়ায় এসে এটি নতুন রূপ পায়।
  • উনবিংশ শতাব্দীতে ভিয়েনার অভিজাত পরিবারগুলোতে এই খাবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
  • বর্তমানে অস্ট্রিয়ার প্রায় সব রেস্টুরেন্টেই উইনার শ্নিটজেল পাওয়া যায়।

কেন এত জনপ্রিয় উইনার শ্নিটজেল?

এই খাবারের জনপ্রিয়তার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।

সহজ উপকরণ

অল্প কিছু উপাদান দিয়েই তৈরি করা যায়।

খাস্তা টেক্সচার

বাইরের আবরণ মচমচে হলেও ভেতরের মাংস থাকে নরম ও রসালো।

শিশু থেকে বড় সবাই পছন্দ করে

হালকা মশলা ব্যবহারের কারণে এটি সব বয়সের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য।

বিভিন্ন সাইড ডিশের সঙ্গে মানানসই

আলুর সালাদ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই কিংবা সবজি দিয়ে পরিবেশন করা যায়।

উইনার শ্নিটজেল তৈরির উপকরণ

চারজনের জন্য প্রয়োজন হবেঃ

মূল উপকরণ

  • বোনলেস মুরগির বুকের মাংস ৪ টুকরা (অথবা ভিল)
  • ময়দা ১ কাপ
  • ডিম ২টি
  • ব্রেডক্রাম্ব ২ কাপ
  • লবণ স্বাদমতো
  • গোলমরিচ গুঁড়া ১ চা চামচ
  • লেবু ১টি
  • ভাজার জন্য পর্যাপ্ত তেল বা পরিশোধিত মাখন

ঐচ্ছিক উপকরণ

  • পাপরিকা গুঁড়া
  • রসুন গুঁড়া
  • পার্সলে পাতা
  • সামান্য সরিষা

ধাপে ধাপে উইনার শ্নিটজেল তৈরির পদ্ধতি

ধাপ ১: মাংস প্রস্তুত করা

  • মাংস ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন।
  • প্লাস্টিক র‍্যাপের মধ্যে রেখে মিট ম্যালেট বা বেলন দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে পাতলা করে নিন।
  • আদর্শ পুরুত্ব হবে প্রায় ৪ থেকে ৫ মিলিমিটার।

ধাপ ২: মসলা মাখানো

  • মাংসে লবণ এবং গোলমরিচ ছিটিয়ে দিন।
  • ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে দিন।

ধাপ ৩: কোটিং প্রস্তুত করা

  • তিনটি আলাদা বাটিতে রাখুন:
  • প্রথম বাটিতে ময়দা।
  • দ্বিতীয় বাটিতে ফেটানো ডিম।
  • তৃতীয় বাটিতে ব্রেডক্রাম্ব।

ধাপ ৪: মাংস কোটিং করা

  • প্রথমে মাংস ময়দায় মাখিয়ে নিন।
  • এরপর ডিমে ডুবিয়ে নিন।
  • সবশেষে ব্রেডক্রাম্ব দিয়ে সম্পূর্ণ ঢেকে দিন।
  • চাপ দিয়ে ব্রেডক্রাম্ব বসাবেন না।
  • হালকা করে লাগাতে হবে।

ধাপ ৫: ভাজা

  • প্যানে পর্যাপ্ত তেল গরম করুন।
  • মাঝারি আঁচে দুই পাশ সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন।
  • প্রতিটি পাশ সাধারণত ২ থেকে ৩ মিনিট সময় নেয়।

ধাপ ৬: পরিবেশন

  • টিস্যু পেপারে তুলে অতিরিক্ত তেল ঝরিয়ে নিন।
  • লেবুর টুকরো দিয়ে পরিবেশন করুন।

নিখুঁত উইনার শ্নিটজেল তৈরির গোপন টিপস

খুব মোটা মাংস ব্যবহার করবেন না

পাতলা মাংস দ্রুত সেদ্ধ হয় এবং খাস্তা হয়।

ব্রেডক্রাম্ব চাপ দিয়ে লাগাবেন না

এতে আবরণ শক্ত হয়ে যেতে পারে।

অতিরিক্ত গরম তেলে ভাজবেন না

বাইরে পুড়ে গেলেও ভেতরে কাঁচা থেকে যেতে পারে।

ভাজার সময় প্যান নাড়াতে থাকুন

এতে ব্রেডক্রাম্ব ফুলে উঠে হালকা ও খাস্তা হবে।

উইনার শ্নিটজেলের সঙ্গে কী পরিবেশন করবেন?

অস্ট্রিয়ায় সাধারণত এটি পরিবেশন করা হয়ঃ

  • আলুর সালাদ
  • পার্সলে আলু
  • ফ্রেঞ্চ ফ্রাই
  • শসার সালাদ
  • ভিনেগার মিশ্রিত সবজি

উইনার শ্নিটজেলের পুষ্টিগুণ

একটি মাঝারি আকারের শ্নিটজেলে আনুমানিক থাকেঃ

  • ক্যালরি: ৪০০ থেকে ৫০০
  • প্রোটিন: ৩০ গ্রাম
  • কার্বোহাইড্রেট: ২৫ গ্রাম
  • চর্বি: ২০ গ্রাম

স্বাস্থ্যকরভাবে উইনার শ্নিটজেল বানানোর উপায়

যারা কম তেলযুক্ত খাবার খেতে চান তারাঃ

  • এয়ার ফ্রায়ার ব্যবহার করতে পারেন
  • ওটসের গুঁড়া ব্যবহার করতে পারেন
  • অলিভ অয়েল স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন

উইনার শ্নিটজেল বানাতে যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন

  • মাংস বেশি পুরু রাখা
  • পুরোনো ব্রেডক্রাম্ব ব্যবহার করা
  • খুব বেশি সময় ভাজা
  • ঠান্ডা তেলে ভাজা শুরু করা

বাংলাদেশে উইনার শ্নিটজেল কতটা জনপ্রিয়?

বর্তমানে রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য বড় শহরের অনেক ইউরোপীয় রেস্টুরেন্টে এই খাবার পরিবেশন করা হয়। তবে বাড়িতে তৈরি করলে খরচ অনেক কম হয় এবং নিজের পছন্দমতো উপকরণ ব্যবহার করা যায়।

শিশুদের জন্য কি উপযুক্ত?

  • হ্যাঁ।
  • কম মশলা ব্যবহার করলে শিশুদের জন্যও এটি উপযুক্ত খাবার হতে পারে।
  • তবে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার নিয়মিত না খাওয়াই ভালো।

FAQ

উইনার শ্নিটজেল কি শুধু বাছুরের মাংস দিয়েই বানাতে হয়?

প্রচলিত অস্ট্রিয়ান রেসিপিতে বাছুরের মাংস ব্যবহার করা হয়। তবে মুরগির মাংস দিয়েও সুস্বাদু সংস্করণ তৈরি করা যায়।

ব্রেডক্রাম্বের পরিবর্তে কী ব্যবহার করা যায়?

ক্রাশ করা কর্নফ্লেক্স বা ওটস ব্যবহার করা যেতে পারে।

এয়ার ফ্রায়ারে বানানো যাবে?

হ্যাঁ। ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১২ থেকে ১৫ মিনিট রান্না করা যায়।

কতদিন সংরক্ষণ করা যায়?

ফ্রিজে বায়ুরোধী পাত্রে ২ দিন পর্যন্ত রাখা যায়।

উপসংহার

উইনার শ্নিটজেল শুধু অস্ট্রিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার নয়, এটি এমন একটি পদ যা সহজ উপকরণ ব্যবহার করেও ঘরে বসে রেস্টুরেন্টের স্বাদ এনে দিতে পারে। খাস্তা বাইরের স্তর, নরম ও রসালো মাংস এবং লেবুর হালকা টক স্বাদ এই খাবারকে আলাদা মাত্রা দেয়। ছুটির দিনে পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন কিছু রান্না করতে চাইলে উইনার শ্নিটজেল হতে পারে দারুণ একটি পছন্দ। সঠিক উপকরণ, ধৈর্য এবং কয়েকটি সহজ কৌশল অনুসরণ করলেই ঘরেই তৈরি করা সম্ভব ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় এই খাবার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন