বিশ্বের অনেক দেশে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আরামদায়ক আবহাওয়া হিসেবে বিবেচিত হলেও সুইডেনে একই তাপমাত্রাকে অনেক সময় হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিষয়টি শুনে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে অবাক লাগতে পারে। কারণ বাংলাদেশ, ভারত কিংবা পাকিস্তানে গ্রীষ্মকালে ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
তাহলে প্রশ্ন হলো, সুইডেনে মাত্র ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকেই কেন তাপপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়? এর পেছনে কি শুধুই ভৌগোলিক কারণ কাজ করে, নাকি মানুষের শারীরিক অভিযোজন, অবকাঠামো এবং জলবায়ুগত বাস্তবতাও এর সঙ্গে জড়িত? এই নিবন্ধে সুইডেনে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে হিটওয়েভ হিসেবে বিবেচনা করার বৈজ্ঞানিক, পরিবেশগত এবং সামাজিক কারণগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
পোস্ট সূচিপত্র
হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ কী?
সুইডেনের জলবায়ু কেমন?
১. মানুষের শারীরিক অভিযোজন বড় কারণ
২. অধিকাংশ বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার নেই
৩. রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে
৪. সুইডিশ আবহাওয়া বিভাগ কী বলে?
৫. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
৬. কৃষি ও পরিবেশের ওপর প্রভাব
৭. জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিটওয়েভের মানদণ্ড
উপসংহার
হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ কী?
হিটওয়েভ বলতে সাধারণত এমন একটি সময়কালকে বোঝায়, যখন কোনো অঞ্চলের স্বাভাবিক গড় তাপমাত্রার তুলনায় কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে। বিশ্বের সব দেশে হিটওয়েভের সংজ্ঞা এক নয়। প্রতিটি দেশ তাদের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার তথ্য, জলবায়ুর ধরন এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনা করে আলাদা মানদণ্ড নির্ধারণ করে।
উদাহরণস্বরূপ,
- বাংলাদেশে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা কয়েক দিন স্থায়ী হলে তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
- অস্ট্রেলিয়ায় অনেক এলাকায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা স্বাভাবিক গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া।
- কিন্তু সুইডেনে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কয়েক দিন স্থায়ী হলে সেটি অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়া হিসেবে গণ্য হয়।
সুইডেনের জলবায়ু কেমন?
সুইডেন উত্তর ইউরোপের একটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ। দেশটির বড় অংশ উত্তর মেরুর কাছাকাছি অবস্থান করায় সেখানে দীর্ঘ শীতকাল এবং তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত গ্রীষ্মকাল দেখা যায়। শীতকালে অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির নিচে নেমে যায়। জানুয়ারি মাসে উত্তর সুইডেনের অনেক এলাকায় তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে গ্রীষ্মকালে সাধারণত তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। ফলে ২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা দেশটির স্বাভাবিক গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
১. মানুষের শারীরিক অভিযোজন বড় কারণ
মানুষের শরীর ধীরে ধীরে তার আশপাশের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। যেসব দেশের মানুষ বছরের অধিকাংশ সময় শীতল পরিবেশে বাস করে, তাদের শরীর উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম অভ্যস্ত। সুইডিশ জনগণ বছরের বেশিরভাগ সময় ০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে বসবাস করেন। ফলে হঠাৎ ২৫ বা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তাদের শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২. অধিকাংশ বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার নেই
বাংলাদেশসহ উষ্ণ অঞ্চলের অনেক বাড়ি ও অফিসে এখন এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সুইডেনে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে বছরের অধিকাংশ সময় ঠান্ডা আবহাওয়া বিরাজ করায় বাড়িঘর নির্মাণ করা হয় তাপ ধরে রাখার উপযোগী করে। অনেক আবাসিক ভবনে কেন্দ্রীয় হিটিং ব্যবস্থা থাকলেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থাকে না। ফলে বাইরের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির বেশি হলে ঘরের ভেতর তাপ জমে গিয়ে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়।
৩. রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে
হিটওয়েভ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নয়, রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। গরমের সময় রাতে পর্যাপ্ত ঠান্ডা না পড়লে মানবদেহ বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পায় না। সুইডেনে গ্রীষ্মকালে দিনের আলো অনেক দীর্ঘ সময় থাকে। উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় সূর্য প্রায় অস্তই যায় না। এর ফলে রাতেও পরিবেশ পর্যাপ্ত ঠান্ডা হতে পারে না। ক্রমাগত কয়েক দিন এই অবস্থা চলতে থাকলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৪. সুইডিশ আবহাওয়া বিভাগ কী বলে?
সুইডেনের আবহাওয়া সংস্থা সাধারণত কয়েক দিনের জন্য ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা স্থায়ী হলে সতর্কতা জারি করে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসও অনেক মানুষের জন্য অস্বস্তিকর ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই কারণে সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে হিটওয়েভ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
৫. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। গত কয়েক দশকে সুইডেনে গ্রীষ্মকাল আগের তুলনায় উষ্ণ হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে সুইডেনে তাপপ্রবাহের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও বাড়ছে। ২০১৮ সালে সুইডেনে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বড় পরিবেশগত সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়।
৬. কৃষি ও পরিবেশের ওপর প্রভাব
দীর্ঘ সময় তাপমাত্রা বেশি থাকলে কৃষিজমির মাটিতে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যায়। ফসল উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। নদী ও হ্রদের পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় জলজ প্রাণীর জীবনচক্রেও পরিবর্তন দেখা দেয়। বনাঞ্চলের গাছপালা অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে পড়লে দাবানলের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
৭. জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
অতিরিক্ত গরমে মানুষের শরীরে পানিশূন্যতা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং হিট স্ট্রোকের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা, হালকা পোশাক পরা এবং সরাসরি রোদে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করার পরামর্শ দেন। বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে হৃদরোগ এবং শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা বাড়তে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিটওয়েভের মানদণ্ড
| দেশ | হিটওয়েভের সাধারণ মানদণ্ড |
|---|---|
| সুইডেন | ২৫-২৬°C কয়েক দিন স্থায়ী |
| যুক্তরাজ্য | ২৮-৩০°C |
| জার্মানি | ৩০°C এর বেশি |
| বাংলাদেশ | ৩৬°C এর বেশি |
| ভারত | ৪০°C এর বেশি |
উপসংহার
সুইডেনে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে হিটওয়েভ হিসেবে বিবেচনা করার পেছনে মূল কারণ হলো দেশটির স্বাভাবিক শীতল জলবায়ু, মানুষের শারীরিক অভিযোজন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। যে তাপমাত্রা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে মনোরম আবহাওয়া বলে মনে হয়, সেটিই সুইডেনের মানুষের জন্য অস্বাভাবিক গরম হতে পারে। তাই তাপপ্রবাহের সংজ্ঞা শুধু একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে স্থানীয় জলবায়ু, পরিবেশ এবং মানুষের অভিযোজন ক্ষমতার ওপর।
সুইডেনের উদাহরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে ভিন্নভাবে অনুভূত হয় এবং সেই অনুযায়ী প্রতিটি দেশকে প্রস্তুতি নিতে হয়।